রং তত্ত্ব (Color Theory)

ভিজুয়াল আর্টে (ভাস্কর্য, চিত্রকর্ম, গ্রাফিকস্- ইত্যাদি) রঙের সঠিক ব্যবহারের গুরুত্ব যে অনেক, এ নিয়ে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। রং কত প্রকার ও কী কী, কোন রং কোথায় দেওয়া উচিত, কোন রঙের সাথে কোন রং মানানসই, রং কীভাবে মানুষের মনে দাগ কাটে- এসব নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। সেসব গবেষণা থেকে এসেছে যে তত্ত্ব, তা-ই রং তত্ত্ব। এই তত্ত্ব নিয়ে একেবারে শুরুর দিকে যাঁরা মাথা ঘামিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে লিওনার্দো দা ভিঞ্চি আছেন।

রং তত্ত্বের মূল বিষয়গুলো হল রং কয় ধরণের হয়, কোন রঙের সাথে কোন রং মেশালে কী হয়, কোন রং চোখের দেখায় ঠাণ্ডা বা গরম মনে হয়, কোন রঙ দেখতে ভারী আর কোনটা হালকা?

এই বিষয়গুলো বুঝতে হলে আগে ‘রঙের চাকা’ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে।

রঙের চাকা (Color Wheel): আগেই বলে রাখি, আলোর ক্ষেত্রে আর ছবি আঁকার ক্ষেত্রে প্রাথমিক রংগুলো (Primary Colors) এক রকম নয়। আমরা জানি, আলোর ক্ষেত্রে প্রাথমিক রংগুলো হচ্ছে লাল, সবুজ, নীল। কিন্তু ছবি আঁকার ক্ষেত্রে নীলের সাথে হলুদ মেশালে সবুজ পাওয়া যায়, তাই এক্ষেত্রে সবুজ প্রাথমিক রং নয়। ছবি আঁকার জন্য মাত্র পাঁচটা রং থাকলে একটার সাথে একটা মিশিয়ে বাকি সব রং বানিয়ে নেওয়া যায়। এই পাঁচটা রং হলো লাল, নীল, হলুদ, কালো, সাদা। কালো আর সাদা দিয়ে আলো-ছায়া বোঝানো হয়, এদুটোকে রং হিসেবে না ধরাই ভালো। তাহলে ছবি আঁকার প্রাথমিক রং তিনটি- লাল, নীল, হলুদ।

প্রাথমিক রংগুলো একটার সাথে আরেকটা মিলে যে তিনটি রং তৈরি করে, সেগুলোকে বলে মাধ্যমিক রং (Secondary Colors)| বেগুনি, সবুজ আর কমলা- এগুলো হচ্ছে মাধ্যমিক রং। কারণ-

লাল + নীল = বেগুনি,

নীল + হলুদ = সবুজ,

হলুদ+ লাল = কমলা।

প্রাথমিক আর মাধ্যমিক রঙগুলো মেশালে যেসব রং পাওয়া যায় সেগুলোর নাম যৌগিক রং (Tertiary Colors)। যেমন-

লাল + বেগুনি = লালচে বেগুনি

নীল + সবুজ = নীলচে সবুজ

হলুদ + কমলা = হলুদাভ কমলা

নীল + বেগুনি = নীলচে বেগুনি

হলুদ + সবুজ = টিয়া

লাল + কমলা = লালচে কমলা

রঙের চাকায় এই তিন ধরণের রং এমনভাবে বসানো হয় যেন একই ধরণের রংগুলো একটা আরেকটার সাথে ত্রিভুজ তৈরি করে (পাশের ছবিটার মত)। এই ব্যপারটাকে বলে রংগুলোর ত্রিভুজীয় সম্পর্ক (Triadic), অনেকটা ত্রিভুজ প্রেমের মত! ত্রিভুজের তিন কোণায় থাকা রংগুলো ভালো সমন্বয় (Color Combination) তৈরি করে।

রং চাকায় রঙের এরকম আরো কিছু সম্পর্ক আছে, যেমন বিপরীত, পাশাপাশি, চতুর্ভুজ ইত্যাদি।

বিপরীত (Complementary):

রং চাকার একটা রঙের ঠিক বিপরীত পাশের রংকে বিপরীত রং বলে- এটা খুব সহজেই অনুমেয়। বিপরীত রংগুলো চমৎকার বৈপরীত্য (Contrast) তৈরি করে, কোনকিছু ফুটিয়ে তোলার জন্য যা প্রয়োজন।

ফেডেক্স আর লা রিভের লোগোতে এই রং সমন্বয় ব্যবহার করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি (Analogous):

নীল, সবুজ, টিয়ে- রং চাকায় এরকম পাশাপাশি রংগুলো দিয়ে দৃষ্টিনন্দন রং সমন্বয় তৈরি করা যায়। যেমন ওলো (Ollo) -এর লোগো।

 

 

চতুর্ভুজ (Tetrad): 

রং চাকার চার কোণার চারটা রং নিয়ে এই সমন্বয় তৈরি হয়। খোদ গুগলের লোগোতেই আছে এর ব্যবহার।

 

 

 

আরেক ধরণের সমন্বয় আছে, নাম – মনোক্রোম্যাটিক (Monochromatic Colors), যেখানে একই রঙের Hue, Tint, Shade, Tone ব্যবহার করে দারুণ সব কালার কম্বিনেশন বানানো যায়।

ভাবছেন এগুলো আবার কী? বলছি, শুনুন-

Hue :

হিউ হচ্ছে রং চাকার সবচেয়ে উজ্জ্বল আর মৌলিক ১২ টি রং- (৩ টি প্রাথমিক, ৩ টি মাধ্যমিক আর ৬ টি যৌগিক রং) যে রংগুলো একত্রে একটি পূর্ণ স্পেকট্রাম তৈরি করে।

Tint :

হিউ এর রংগুলোর সাথে সাদা মেশালে যেসব রং পাওয়া যায়, সেগুলোই হচ্ছে ঐ মূল রংগুলোর Tint।

Shade:

হিউ এর রংগুলোর সাথে কালো মেশালে রংগুলোর শেডস্ পাওয়া যায়।

Tone:

হিউ এর রংগুলোর সাথে ধুসর মেশালেই পাওয়া যায় রংগুলোর টোন।

বিভিন্ন মাত্রায় সাদা, কালো বা ধুসর মিশিয়ে একই হিউ এর অনেকগুলো Tint, Shade বা Tone পাওয়া যায়।

 

Hue, Tint, Shade আর Tone নিয়ে তো বললাম, এবার ফিরে আসি মনোক্রোম্যাটিক সমন্বয়ের প্রসঙ্গে।

একটা হিউ এর এক বা তার বেশি Tint, Shade বা Tone নিয়ে যে কালার কম্বিনেশন তৈরি হয়

তাকেই মনোক্রোম্যাটিক কালার্স বলে।

 

মানবমনে রঙের প্রভাব (Color Psychology):

একেকটা রং একেক ভাবে মানবমনে প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব এমনই শক্তিশালী যে, চিকিৎসা ক্ষেত্রে স্টিমুল্যান্ট, প্লাসিবো বা স্বান্ত্বনামূলক ওষুধ বানাতে দেহমন চাঙা করার জন্য উজ্জ্বল কমলা বা লাল রং ব্যবহার করা হয়। লাল মানুষকে উত্তেজিত করে, এমন কি খিদেও বাড়িয়ে দেয়, এজন্য বেশির ভাগ খাবারের ব্র্যান্ডগুলো লাল রং ব্যবহার করে।

হলুদ মানে আবেগ, আশা, সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস।

আর সবুজ হচ্ছে প্রকৃতি, ভারসাম্য, ইতিবাচকতা- ইত্যাদির প্রতীক।

ভারি রং- হাল্কা রং (Visual Weight of Colors):

মনস্তত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড বুলো ১৯০৭ সালে মজার একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছিলেন, যেখানে তিনি একটা দশ ফিট ওয়ালের মাঝ বরাবর আড়াআড়ি একটা দাগ টেনে দেয়ালটিকে দুভাগে ভাগ করলেন। তারপর কয়েক জন মানুষকে দুটো রঙের বালতি দিলেন- একটায় লাল, আরেকটায় গোলাপি। রংদুটো দেয়ালের দাগের উপরে বা নিচে ব্যবহার করা যাবে। দেখা গেল, সবাই নিচে লাল আর উপরে গোলাপি রং ব্যবহার করেছে।

কারণটা সোজা, লালের চেয়ে গোলাপি দেখতে একটু হালকা, নিচে তাই ভারী রংটাই রেখেছে সবাই। সবাই জানে যে, একই রকম দুটো ইটের একটায় লাল আরেকটায় গোলাপি রং লাগিয়ে ওজন করলে ওজনে কোন তারতম্য হবে না, কিন্তু গোলাপি দেখতে একটু নাজুক, হালকা।

একটি হিউ এর Tint গুলো হালকা আর শেডগুলো ভারী বলে ধরা হয়। মূল রংগুলোর মধ্যেও একটা আরেকটার চেয়ে ভারী বা হালকা হতে পারে, যেমন লালের চেয়ে হলুদ হালকা, নীল ভারী।

রঙের ঠাণ্ডা -গরম (Color Temperature):

রং চাকার বামদিকের রংগুলো (লাল, কমলা, হলুদ ইত্যাদি) অপেক্ষাকৃত গরম আর ডানদিকের রংগুলো (বেগুনী, নীল, সবুজ ইত্যাদি) ঠাণ্ডা। রঙের এই ঠাণ্ডা-গরমের ব্যাপারটা রীতিমত কেলভিন এককে পরিমাপ করা হয়। বিশেষ করে ফটোগ্রাফি বা সিনেমাটোগ্রাফিতে রঙের তাপমাত্রার একটা বড় ভূমিকা আছে।

 

Source :

unifiedspace.wordpress.com

tigercolor.com

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *